
নিষ্পেষিত শ্রমজীবী মানুষ! সেই নির্মম জুলুম আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ানো এক ঐতিহাসিক সংগ্রামের নাম মে দিবস। যে বৈষম্যের শুরু প্রায় ২৩০ বছর আগে আমেরিকায়। যেখানে একজন শ্রমিক বিরতিহীন ১৬ ঘন্টা কাজ করে পারিশ্রমিক পেয়েছে খুবই সামান্য। ওই সময়ে তাদের লড়াই সংগ্রাম আর শ্রমিক হতাহতের রক্তাক্ত পথ বেয়ে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠা পায় শ্রমিকদের দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজ করার দাবি ও মজুরী বৈষম্যের আহবান। এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিশ্বের প্রায় সব শ্রমিক সংগঠন পয়লা মে বাধ্যতামূলক কাজ না করার সিদ্ধান্ত নেয়। আর সেই থেকে প্রতিবছর ঘটা করে একই ধাঁচে পালিত হয় মে’ডে বা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস।
বিশ্বের অনেক দেশেই মে’ডে-পরিচিতি প্রাচীন এক বসন্তের উৎসব হিসেবে। কিন্তু বর্তমানে এটা বেশি পরিচিত আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে। বিশ্বজুড়ে শ্রমিকদের ঐতিহাসিক সংগ্রাম ও অর্জনের কথা মনে করিয়ে দিতেই দিনটি পালিত হয়ে থাকে। প্রতি বছর কাজের পরিবেশ আরও ভালো করা এবং ট্রেড ইউনিয়নকে শক্তিশালী করার দাবিতে বিশ্বজুড়ে এ দিন নানা প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়। তবে এখনো রয়ে গেছে ন্যায্য পাওনা ও কাজের বৈষম্য। আর একটি শ্রেণি তাদের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য শ্রমিকদের যখন তখন ছাটাই ও হত্যার মতো ঘটনাতো আছেই। শুরুর দিকে এই দিবসটি বিভিন্ন সামাজিক ও সমাজতান্ত্রিক সংস্থা এবং শ্রমিক সংগঠনগুলো পালন করতো। যদিও এই দিবসের পেছনের আসল প্রতিবাদটি হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে, কিন্তু সেখানে সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সোমবার পালন করা হয় এ দিবস।
এ দিনে যদি কল্পণা করা যায় বিশ্বের কয়লা খনির সব শ্রমিকের অবর্ণনীয় দূর্ভোগের কথা। তাদের কোন অধিকার নেই! নেই কোন বিশ্রামের বাঁধা ধরা নিয়ম আর জীবনের নিরাপত্তা। এক শ্রেণির জুলুমবাজ নিয়োগকর্তার হাতে অদৃশ্য বন্দি তারা। অপরদিকে, জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আয় করা শ্রমের মজুরি নিতে কতই না নাজুক অবস্থা। এমন খবর বিশ্ব মোড়লদের অজানা নয়। আর মাথার ওপর থেকে খনির ছাদ ধ্বসে শ্রমিক মৃত্যুর খবর গণমাধ্যমে প্রচারতো নিয়মতান্ত্রিক বিষয়। তাহলে স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে আন্দোলন সংগ্রামের এতো বছর পর কতটা সুখে আছে শ্রমিক সমাজ।

অপরদিকে, শ্রমের কঠিনতম স্থানগুলোর একটি হচ্ছে স্টিল রি-রোলিং মিলগুলো। যেখানে আগুনের লেলিহান শিখা ও প্রচণ্ড গরমে দিবসের শুরু হয় একজন শ্রমিকের। মনে হয় দিন রাত সমান তালে চলছে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শ্রমিকের যে কাজের সময় এবং মজুরী তা বিভিন্ন কারণে বিতর্কিত। যার পেছনেও সুবিধাভোগী এবং উচ্চবিত্তের অপতৎপরতাকে দায়ি করা হয়। এখানে শ্রমের বাজার এখনো খুব সস্তা। তাই বিদেশীদের নজর কেড়েছে গার্মেণ্ট সেক্টরের শ্রমিক মজুরিতে। এ কারণে এ শিল্পে বিদেশী বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কম নয়। কিন্তুু শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি আদায়ে চলে নিয়মিত লড়াই সংগ্রাম। তবে শিশু শ্রমে বিশ্বে এগিয়ে বাংলাদেশ। তাদের বিষয়ে কোন ভালো উদ্যোগ নিতে পারেনি দেশের সরকারগুলো।
আর বিশ্বে যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান শিশু ও শ্রমিকদের কল্যাণে কাজ করে। তাদের উন্নত পরিকল্পনার বাস্তবায়নও বিশ্বের কোন দেশে শতভাগ বাস্তবায়নের নজির নেই। অপরদিকে ব্যক্তি-সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা কিংবা ক্ষমতা এবং অর্থলোভীদের স্বার্থের যাতাকলে পৃষ্ঠ হচ্ছে বিশ্বের আজকের শ্রমিক সমাজ ও তাদের কর্মঘন্টার মজুরি। তাই যুগ আর শতাব্দী পার হয়ে যায়! কে ফোটাবে শ্রমিকের মুখে শতভাগ হাসি। এমন সাধ্য আছে কার। এমন প্রশ্নের জবাব কোথায়?
দৃষ্টি ফেরাই মে দিবসের ইতিহাসে: প্রচার আছে আমেরিকার শ্রমিকেরা ১৮৮১ সালের নভেম্বর মাসে ‘আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার’ প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ১৮৮৪ সালের ৭ অক্টোবর ফেডারেশন অব লেবারের চতুর্থ সম্মেলনে গৃহীত হয় একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। যেখানে ১৮৮৬ সালের ১ মে সর্বাত্মক ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়। ওই বছর ব্রিটিশ সমাজ সংস্কারক রবার্ট ওয়েনের এক চিন্তা থেকে, যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে ট্রেড ইউনিয়নগুলো দিনে ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে প্রতিবাদ কর্মসূচি শুরু করে। ওই সময় একই দাবিতে সর্বাত্মক ধর্মঘট ডাকে বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা। বছরের পর বছর চলতে থাকা এই অন্যায় ও অসাম্যের বিরুদ্ধে শ্রমজীবী মানুষেরা পথে নামেন।
রবার্ট ওয়েন ৮ ঘণ্টা কাজের দাবি পূরণে স্লোগান ঠিক করেন, '৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা বিনোদন এবং ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম'। তবে সবচেয়ে বড় আন্দোলনটা হয় পহেলা মে শিকাগোতে, যেখানে প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক সমবেত হন। সে সময় কারখানায় কোন নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা বা বিশ্রাম ছাড়াই টানা কাজ করে যাওয়াটা স্বাভাবিক ছিল। আর সে সময় শিকাগো ছিল যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পকারখানা ও ইউনিয়ন সংগঠনগুলোর কেন্দ্রবিন্দু।
সে দিন তারা চাইছিলেন, সরকার সব কারখানায় শ্রমিকদের কাজের সময়সীমা ৮ ঘণ্টা বেঁধে দিক। এর অতিরিক্ত সময় বা শ্রম দিলে তাদের আলাদা পারিশ্রমিক দিতে হবে। সেটি প্রতিহত করতে নিরস্ত্র শ্রমিকদের ওপর গুলি চালায় স্থানীয় পুলিশ। তাদের গুলিতে অসংখ্য শ্রমিক হতাহত হন। এই ঘটনার সূত্র ধরে ৩ মে ম্যাককর্মিক হার্ভাস্টার কারখানায় শ্রমিকেরা রাজপথে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। পুলিশ সেখানেও গুলি চালায়। তাতে প্রাণ হারান কয়েকজন নিরীহ শ্রমিক।
এর পরদিন ৪ মে পুলিশি হত্যার প্রতিবাদে শিকাগোর হে মার্কেট স্কয়ারে আয়োজিত হয় এক বিশাল প্রতিবাদ সভা। পুলিশ এই সভায়ও গুলি চালায়। শ্রমিকের রক্তে রঞ্জিত হয় হে মার্কেট স্কয়ার। সভা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ৪ শ্রমিকনেতাকে। বিচারে তাঁদের ফাঁসির আদেশ হয়। শিকাগো শহরের রক্তাক্ত ইতিহাস সারা বিশ্বে শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে আলোড়ন তোলে। আমেরিকার শ্রমিকেরা বৃহত্তর আন্দোলনের পথে পা বাড়ান। জানা যায়, ওই ধর্মঘটে প্রায় ৫ লাখ শ্রমিক পথে নামেন। অপরদিকে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে শ্রমিক সংগঠন গড়ে ওঠে। অধিকার আদায়ে শ্রমিকেরা কারখানা ছেড়ে নামেন পথে। শ্রমজীবী মানুষেরা রক্তে রঞ্জিত পথেই অধিকার আদায় করেন।
এ ঘটনার দুই বছর পর ১৮৮৯ সালে প্যারিসে ফরাসি বিপ্লবের শত বছর পূর্তিতে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের প্রথম কংগ্রেসে শিকাগো শ্রমিক আন্দোলনের দিনটিকে পরবর্তী সন (১৯৯০) থেকে পালনের প্রস্তাব দেয়া হয় এবং ১৮৯১ সালে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় কংগ্রেসে প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। পরে ১৯০৪ সালে নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে অনুষ্ঠিত সমাজতন্ত্রীদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণের দাবি আদায় এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্বব্যাপী মে মাসের প্রথম দিন মিছিল ও শোভাযাত্রার আয়োজন করতে সব সমাজবাদী গণতান্ত্রিক দল ও শ্রমিক সংঘের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
জানা গেছে, দক্ষিণ ইউরোপে প্রথম মে দিবস পালনে এগিয়ে আসে স্লোভেনিয়ান এবং ক্রোয়াটরা। যারা সে সময় অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কাজের নিচু পরিবেশ, অল্প বেতন এবং দীর্ঘ কর্মঘণ্টার প্রতিবাদে ১৮৯৩ সালে সার্বিয়ার শ্রমিকরা এক মে দিবস র্যালি বের করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যখন দ্রুত শিল্প কারখানায় উন্নতি ঘটতে থাকে, তখন রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পরও বিশ্বজুড়ে শ্রমিকরা মৌলিক চাহিদা পূরণে সংগ্রাম করতে থাকে। অপরদিকে, জার্মানিতে ১৯৩৩ সালে নাৎসি পার্টি ক্ষমতায় আসার পর শ্রমিক দিবসের দিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়। সমাজতান্ত্রিক নেতারা বিশ্বাস করতেন এই নতুন ঘোষিত ছুটি ও উৎসব ইউরোপ এবং আমেরিকার শ্রমিক শ্রেণীকেও উদ্বুদ্ধ করবে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে একীভূত লড়াইয়ে।
এ ছাড়াও আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন-আইএলও তাদের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বলছে, বেকারত্ব কমানো এবং কাজের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আসলেও, বেশিরভাগ জি-২০ দেশে গত বছরের মুদ্রাস্ফীতির সাথে তাল রেখে মূল বেতন ভাতা দিতে পারেনি। আর ২০২৩ সনে ক্রয়ক্ষমতা (পিপিপি) অনুযায়ী চরম দারিদ্রসীমায় থাকা শ্রমিক যাদের আয় দিনে ২ দশমিক ১৫ ডলারেরও কম, তাদের সংখ্যা বিশ্বব্যাপী প্রায় ১০ লাখ বেড়েছে। আর বিশ্বজুড়ে সহনীয় দারিদ্র্য সীমায় থাকা শ্রমিকের সংখ্যা (ক্রয়ক্ষমতা অনুযায়ী যাদের দৈনিক আয় ৩ দশমিক ৬৫ ডলারের কম) বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৮৪ লাখ।
Advising Editor : -- -- -- -- -- --
Chief Editor : -- -- -- -- -- --
Editor : Bablu Rahman
Executive Editor : Abdur Rahman Khan
---
Corporete Office: Level 9-A,
Confidence Center, Sahjadpur,
Gulshan, Dhaka
---
© Dailybanglavoice.com