
পেশা এবং শিক্ষাগত মানোন্নয়নে কারিকুলাম পরিবর্তনসহ সরকারের ১২ দফা রূপরেখা তুলে ধরেছে বাংলাদেশ ফার্মাসিস্টস ফোরাম। এর মধ্যে ফার্মেসি পেশাকে সমৃদ্ধ করার বিষয়টির ওপর তারা গুরুত্ব দিয়েছেন। গত রোববার (২৭ এপ্রিল) সরকারের বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিল অডিটোরিয়ামে কাউন্সিলের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ফার্মাসিস্টস ফোরামের আলোচনা সভায় এ রূপরেখা তুলে ধরা হয়।
ফার্মেসি কাউন্সিলের সচিব মোহাম্মদ মাহবুবুল হকের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় বাংলাদেশ ফার্মাসিস্টস ফোরামের সভাপতি মো. আজিবুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান তানভীর, শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক মো. সাদ্দাম হোসেন, শিক্ষা ও গবেষণা বিষয়ক সহ-সম্পাদক নুরুল ইসলাম নাহিদসহ বাংলাদেশ ফার্মাসিস্টস ফোরামের অন্য নেতারা এতে অংশ নেন।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব রূপরেখা বাস্তবায়িত হলে দেশের হাসপাতাল, ক্লিনিক ও কমিউনিটি পর্যায়ে নিরাপদ ও আধুনিক ওষুধ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ফার্মাসিস্টদের জন্য স্পষ্ট ক্যারিয়ার গঠন ও দক্ষ মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
আলোচনা সভায় ফার্মেসি কাউন্সিলেন সচিব মোহাম্মদ মাহবুবুল হক হসপিটাল ফার্মেসি বাস্তবায়নে পেশাগত এবং শিক্ষাগত মানোন্নয়নে বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিলের কার্যক্রম এবং অগ্রগতি তুলে ধরেন।
এ সময় ফার্মাসিস্টস ফোরামের সভাপতি মো. আজিবুর রহমান বলেছেন, 'স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সারাদেশে সরকারি হাসপাতালে ফার্মেসি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রায় ৭০০ সরকারি ফার্মেসি করার উদ্যোগ নিয়েছেন, যা খুবই প্রশংসনীয়। এই উদ্যোগ সঠিক ভাবে বাস্তবায়নে আমাদের পূর্ণ সহযোগিতা থাকবে।
ইতোমধ্যে দেশে ২২ হাজার রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট রয়েছে। ৪৬টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় ৮ হাজার শিক্ষার্থী ফার্মেসি অধ্যায়নরত। সরকারের যে কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়ন করার জন্য পর্যাপ্ত দক্ষ জনবলও রয়েছে। তাই হসপিটাল ফার্মেসি, কমিউনিটি ফার্মেসি, ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে এবং সকল বিশ্ববিদ্যালয় অতিদ্রুত ফার্মেসি বিভাগ চালু করে কোর্স কারিকুলামে পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ১২ দফা রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।'
অপরদিকে "গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের তত্ত্বাবধানেই শুধুমাত্র ওষুধের দোকান রূপান্তরিত হতে পারে ফার্মেসিতে। সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমানের এমন বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়ে ফোরাম সভাপতি বলেছেন, 'সরকারের এমন চিন্তা ইতিবাচক, এটি ফার্মেসিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীতের প্রতিশ্রুতি।'
সভায় সরকার কর্তৃক প্রস্তাবিত হসপিটাল ফার্মেসি সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য বি-ফার্মের সিলেবাসে ক্লিনিক্যাল ফার্মেসির ওষুধ ডিস্ট্রিবিউশন, রেশনাল ইউজ অব ড্রাগ, থেরাপিউটিক ফার্মেসিসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্তকরণ এবং ৪ বছরের পরিবর্তে ১ বছর বাড়িয়ে ৫ বছরে উন্নীত করার পাশাপাশি হসপিটালে ৬ মাসের ইন্টার্নশিপ কার্যক্রম চালু করার প্রস্তাব দেন ফোরাম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মেহেদী হাসান তানভীর।
ফার্মাসিস্টদের ১২ দফা দাবিসমূহ হচ্ছে-
১. হসপিটাল ফার্মেসি, ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি এবং কমিউনিটি ফার্মেসির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সফল করা, ফার্মেসি কাউন্সিল স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ এবং ধারাবাহিকভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক ও টেকনিক্যাল সহযোগিতা প্রদান করতে হবে। এতে করে সার্ভিস বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী এবং কার্যকর হবে।
২. গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের তত্ত্বাবধানে সারাদেশে ফার্মেসি নেটওয়ার্ক গঠনের ঘোষণা অনুযায়ী, ফার্মেসব কাউন্সিলকে দক্ষ গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট তৈরির জন্য দ্রুত ফার্ম-ডি (Doctor of Pharmacy) প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন এবং পর্যাপ্ত ট্রেনিংয়ের পদক্ষেপ নিতে হবে।
৩. পর্যায়ক্রমে দেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি প্রোগ্রামকে বি-ফার্ম থেকে ফার্ম-ডি’তে রূপান্তর করতে হবে। হসপিটাল ও ক্লিনিক্যাল ফার্মেসির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ফার্মেসব কাউন্সিলের পুরাতন কারিকুলাম বাতিল ঘোষণা করে সকল বি-ফার্ম ও ফার্ম-ডি প্রোগ্রামে ফার্মাকোথেরাপি, ফার্মাসিউটিক্যাল কেয়ার, পেশেন্ট সেইফটি, ফরেনসিক মেডিসিন, এমবুলেটরী কেয়ার, ইন্টার্নাল মেডিসিন, ফার্মাকোজেনোমিকস, ফার্মাকোএপিডেমিওলজি, নিউক্লিয়ার ফার্মেসি কোর্সসমূহ বাধ্যতামূলক অন্তর্ভুক্ত করা।
৪. হসপিটাল ফার্মেসি বাস্তবায়ন পরবর্তী ফার্মাসিস্টদের জন্য সুস্পষ্ট ক্যারিয়ার পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য ফার্মাসিস্ট, ফার্মাসিস্ট (ক্লিনিক্যাল), সিনিয়র ফার্মাসিস্ট, চিফ ফার্মাসিস্ট, ফার্মেসি ডিরেক্টর পদসমূহ বাস্তবায়নের সুযোগ রাখতে হবে।
৫. ফার্মাসিউটিক্যাল সার্ভিসের সুষ্ঠু তদারকির জন্য একজন উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন পরিচালক নিযুক্ত করে পৃথক ফার্মেসি পরিদপ্তর স্থাপনের উদ্যোগ নেয়ার দাবি।
৬. ফার্মেসিতে ডিপ্লোমাধারীদের জন্য সরকারি-বেসরকারি নিয়োগের সকল সার্কুলারে "ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট" শব্দটি নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। সে জন্য অবশ্যই কাউন্সিলকে তদারকি করতে হবে।
৭. ফার্মেসি প্র্যাক্টিস অ্যাক্ট/ রেগুলেশনস বাস্তবায়ন ছাড়া শতভাগ ফার্মাসিউটিক্যাল সার্ভিস নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বর্তমানে অনেকস্থানে ফার্মেসি কাউন্সিলের রেজিস্ট্রেশনবিহীন ব্যক্তি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও কমিউনিটি পর্যায়ে অবৈধভাবে ফার্মেসি প্র্যাক্টিস করে আসছে, যা অনতিবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি ফার্মাসিস্ট, ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট ও ফার্মেসি টেকনিশিয়ানের দায়িত্ব ও কাজের পরিধি নির্ধারণে হসপিটাল ফার্মেসি কমিটি ও ফার্মেসব কাউন্সিলের যৌথ উদ্যোগে দ্রুত ফার্মেসব প্র্যাক্টিস অ্যাক্ট/রেগুলেশনস কার্যকর করতে হবে।
৮. সরকারি হাসপাতালে ফার্মাসিস্টদের ইন্টার্নশিপের ব্যবস্থা করতে হবে এবং তাদের জন্য সুপরিকল্পিত গাইডলাইন তৈরি করতে হবে। যেখানে প্রকৃত হসপিটাল ফার্মাসিস্ট হিসেবে ইন্টার্নশিপের সুযোগ থাকতে হবে। সরকারি হাসপাতালে ইন্টার্নশিপ প্রক্রিয়া সহজ করার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চুক্তি করতে হবে। উচ্চতর প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে ক্রমান্বয়ে ফার্মেসব রেসিডেন্সি প্রোগ্রাম চালুর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ফার্মেসি কাউন্সিলকে গ্রহণ করতে হবে।
৯. বি-ফার্ম ডিগ্রিধারীদের জন্য কোর্স শেষ করার পর ২ বছর মেয়াদি ফার্ম-ডি (Post Baccalaureate) করার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। এ লক্ষ্যে ফার্মেসি কাউন্সিলকে দ্রুত উপযুক্ত কোর্স কারিকুলাম প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে হবে।
১০.ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩-এর আলোকে, ৩ মাস মেয়াদি ফার্মেসি রেজিস্ট্রেশন কোর্সধারীদের "ফার্মেসি টেকনিশিয়ান" হিসেবে পুনঃপরিচিত করতে হবে। এ লক্ষ্যে, ফার্মেসি কাউন্সিলের ওয়েবসাইট থেকে এ, বি, সি গ্রেড বিভাজন বিলুপ্ত করতে হবে। একই সাথে, ফার্মেসি টেকনিশিয়ান কোর্সের মেয়াদ বৃদ্ধি করে ন্যূনতম ৬ মাস থেকে ১ বছর মেয়াদ করা জরুরি, যাতে প্রশিক্ষণের মান ও দক্ষতা আরও উন্নত হয়।
১১. ফার্মেসি কাউন্সিলের নিকট বর্তমানে যে ফার্মেসি আইনের খসড়া রয়েছে, সেটির সময়োপযোগী সংশোধন ও সম্পাদনা করে দ্রুত আইনে রূপান্তরের উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।
১২. ফার্মেসি কাউন্সিলের অধীনে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের জন্য প্রায়োরিটি সার্ভিস চালু করতে হবে, যাতে দ্রুত নিবন্ধন, সার্টিফিকেট এবং অন্যান্য পরিষেবা নিশ্চিত হয়।
এডিটরস প্যানেল/হাবিব
Advising Editor : -- -- -- -- -- --
Chief Editor : -- -- -- -- -- --
Editor : Bablu Rahman
Executive Editor : Abdur Rahman Khan
---
Corporete Office: Level 9-A,
Confidence Center, Sahjadpur,
Gulshan, Dhaka
---
© Dailybanglavoice.com