বাংলাদেশের ভোলা জেলা শহর থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরে সাগরের কোলঘেঁষে মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর মোহনায় গড়ে উঠেছে চর কুকরি মুকরি। এটি দেশের অন্যতম বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত। এই চরটি তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়। এক সময় এই চরে শুধুমাত্র কুকুর ও ইঁদুরের দেখা মিলত। এ কারণেই এর নামকরণ করা হয় চর কুকরি মুকরি।
ইতিহাসও বেশ প্রাচীন এই চরটির। প্রায় ৭ শতাব্দী আগে পর্তুগিজ জলদস্যুরা এই এলাকায় তাদের আস্তানা গড়ে তোলে। তবে এক সময় চরটি পানির নিচে তলিয়ে যায়। ১৯১২ সালে এটি আবার জেগে ওঠে এবং পরবর্তীতে এ অঞ্চলের মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে। বর্তমানে এটি দক্ষিণাঞ্চলের বিখ্যাত একটি পর্যটন কেন্দ্র।
যাত্রা শুরু: সড়ক পথে যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। কিংবা নদী পথে রাতে ঢাকা সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে যাত্রা শুরু করবেন। দেখবেন বুড়িগঙ্গা নদী পার হওয়ার সময় রাজধানীর চিরাচরিত ব্যস্ততা পেছনে ফেলে চাঁদের আলো আর নদীর নীরবতায় ভেসে যাওয়ার মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। ভোর ছয়টায় লঞ্চ বেতুয়াঘাটে পৌঁছায়। সেখান থেকে অটোরিকশায় প্রায় এক ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে কচ্ছপিয়া ঘাটে যেতে হবে। ওই ঘাটে সকালের নাস্তা সেরে আবার প্রায় আড়াই ঘণ্টার লঞ্চ যাত্রায় আপনি পৌঁছে যাবেন কাঙ্খিত চর কুকরি মুকরি।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য: লঞ্চ থেকে নামতেই চর কুকরি মুকরির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মন জয় করে। নদীর মাঝে চলমান ট্রলারের চারপাশে বিস্তৃত সবুজ বনভূমি, আকাশে উড়ে যাওয়া নানা জাতের পাখি, পাড়ের ম্যানগ্রোভের কিনারায় মহিষের পাল-সব কিছু মিলে এক সম্মোহিত পরিবেশ। চরে বিচরণরত বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর মধ্যে রয়েছে চিত্রা হরিণ, বন্য মহিষ, বন মোরগ, শিয়াল, বানর, উদবিড়াল এবং বনের গরু। পাখিদের মধ্যে বক, শঙ্খচিল, কোয়েল, কাঠময়ূরসহ নানা প্রজাতি দেখা যায়। শীতকালে পর্যটকদের ভিড় বেড়ে যাওয়ায় প্রাণীদের কাছাকাছি দেখা কিছুটা কঠিন হলেও চরজুড়ে তাদের উপস্থিতি অনুভব করা যায়।
এ ছাড়াও নদীর পাশের নিরিবিলি পরিবেশ, বিশাল বালিয়াড়ি, আর ঢেউয়ের গর্জন চরটিকে যেন একটি মিনি সমুদ্র সৈকতে রূপান্তরিত করেছে।
সূর্যাস্তের মোহনীয়তা: ঘাট থেকে প্রায় এক কিলোমিটারের মধ্যে একটি নির্জন জায়গায় তাঁবু টানাতে পারেন। বিকেল হলে তাঁবু থেকে বের হয়ে সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করবেন। সূর্যের শেষ রশ্মি পশ্চিম আকাশে রূপালী আলো ছড়িয়ে দেয়। এ সময় প্রকৃতি যেন আরও মোহনীয় হয়ে ওঠে। একপাশে বিস্তীর্ন চর-নদী, বিপরীত পাশে জঙ্গল আর নদী কিনারায় ভেঙে- নুইয়ে পড়া বিভিন্ন গাছের শিঁকড়মূল যার ফাঁক-ফোকর দিয়ে ঠিকরে পরছিল অস্তাচলের রঙ।
পর্যটকদের সুবিধা-অসুবিধা: চর কুকরি মুকরিতে থাকা-খাওয়ার সুবিধা সীমিত। সাথে নেয়া কিছু শুকনো খাবার ওই সময় আপনার খুব কাজে আসবে। কিছু সমস্যার মধ্যে পুরো এলাকায় একটি মাত্র রেস্টুরেন্ট রয়েছে। যা ট্যুরিস্টদের বড় কোন দল সামলাতে অনেকটা হিমশিম খায়। দুপুরে জাউভাত আর মাংস দিয়ে কোনোভাবে খাবার সেরে নিতে পারেন। যদিও খাবারের এই সামান্য ঝামেলা কিছুটা অসুবিধা সৃষ্টি করে, তবে চরটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সবকিছু ভুলিয়ে দেয়।
চর কুকরি মুকরি ভ্রমণ প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বন্যপ্রাণী এবং নির্জনতার মেলবন্ধন এই জায়গাটিকে করে তুলেছে স্বপ্নের মতো। এ কারণেই পর্যটকরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি, নিবিড় ভালোলাগার অন্যতম চিরসবুজ প্রশান্তি চর কুকরি মুকরি ভ্রমণকে মনে রাখে আজীবন।
Editor’s Panel/Habib


